রাফিয়া খন্দকার- এর তিনটি অনুগল্প :
তবুও জীবন
চৈত্রের বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা প্রায়, তবু এখনো বেশ চনমনে রোদ। এক ফোটা ঘাম মানিক মিয়ার জুলফি বেয়ে থুতনির কাছটায় এসে বিকেলের তেছড়া আলোয় ঝলমল করতে লাগলো। মানিক মিয়া ডান হাতের পিঠ দিয়ে মুখটা একবার মুছে হাতের দিকে তাকিয়ে দেখলো পশমগুলো ঘামে একেবারে লেপ্টে গেছে। সে এমনিতেই তুলনামূলক বেশি ঘামে, তার উপর আজ যা গরম পড়েছে!
মুখভরা দাড়ি-গোঁফ তার একদম পছন্দ না। কিন্তু দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় সে দেখেছে, দাড়িওয়ালা লোকের প্রতি মানুষের সহানুভূতি বেশি, সন্দেহ কম।তার পেশায় লোকের মনে সন্দেহ না জাগানোর ব্যপারটা অতি গুরুত্বপূর্ণ, কেবলমাত্র এ কারণেই সে দাড়ি কাটেনা।
মানিক মিয়া তার অপেক্ষাকৃত সরু পা টা ছ্যাঁচড়াতে ছ্যাঁচড়াতে স্টেশন বরাবর হাঁটা ধরলো।ওদিকটায় মানুষের ভীড় বেশি, গাদাগাদির মাঝে কাজ হাসিলের সুবিধা। একটু পরেই সন্ধ্যের ট্রেন এসে থামবে, দীর্ঘ যাত্রা শেষে অবসন্ন যাত্রীরা এ সময়টায় একটু বেখেয়াল থাকে। এই সুযোগেরই সৎব্যবহার করে মানিক।
খানিক বাদেই অপেক্ষমান যাত্রীদের ভেতর চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে হুইসেল দিতে-দিতে ট্রেইনটা প্রবেশ করলো।মানিক মিয়া ঠোঁট গোল করে শিস দিতে-দিতেও দিল না। সাধারণ মানুষ রাস্তাঘাটে শিস বাজানো লোকজনকে খুব একটা সুবিধার চোখে দেখে না, ভুরু কুঁচকে তাকায়।
পড়নের আঁটো শার্টটা টানতে-টানতে মানিক মিয়া উঠে দাঁড়ালো।প্রথমেই ক'হাত দূরে কোট-টাই পড়া পুরোদস্তুর ভদ্রলোক চেহারার এক লোকের উপর চোখ গেল তার।এসির বাতাসে অভ্যস্ত চামড়া ফ্যাকাসে সাদা হয়ে গেছে, পয়সার আঁচে গাল লাল।পোশাক আশাকের হাল আর দাঁড়ানোর ভঙ্গি বলে দিচ্ছে ইনি যাত্রী নন, কাউকে হয়তো নিয়ে যেতে এসেছেন।এ ধরণের লোকজনের পকেটে ক্যাশ তেমন থাকে না, এদের সব খেল কার্ডে হয়, সুতরাং এ ব্যাটা বাদ। আরো কিছুটা দূরে লম্বা মতোন এক লোকের উপর নজর গেল মানিক মিয়ার।ফুল হাতা শার্ট ইন করে পড়া হাফ টেকো এক ভদ্রলোক।দীর্ঘ যাত্রার চিহ্নস্বরূপ ইস্ত্রি করা শার্ট কুঁচকে গেছে। চুলের দশাই বলে দিচ্ছে পকেটের অবস্থা বেশ ভালো। পয়সার হিসেব কষতে-কষতে এদের মাথার চুল পড়ে যায়।অর্থনৈতিক ভাবে পঙ্গু লোকের মাথায় সচরাচর টাক দেখা যায় না। মানিক চতুর চোখে আশপাশে একবার চোখ বুলিয়ে খুব ব্যস্ত ভঙ্গিতে যাত্রীদের ভীড়ের মাঝে মিশে গেলো।
পাশ দিয়ে যাবার সময় মানিক তার দীর্ঘদিনের অভ্যস্ত হাতে আলগোছে লোকটার মানিব্যাগ তুলে নিজের পকেটে সরিয়ে ফেললো।দ্রুত পায়ে সে যখন স্টেশন এলাকা পরিত্যাগ করতে যাবে, ঠিক তখনই পেছন থেকে কে যেন চিৎকার করে উঠলো, "পকেটমার, পকেটমার!"
অচল পা টাকে বশ মানিয়ে জীবনের শ্রেষ্ঠ দৌঁড়ের রেকর্ড করা থেকে অনেক কষ্টে মানিক নিজেকে নিবৃত্ত করলো।চোখের পলকে সে মানিব্যাগটা কায়দা করে পাশের এক টোকাই ছেলের বস্তায় চালান করে দিয়ে চোখেমুখে খানিকটা বিস্ময়, খানিকটা অস্বস্তি আর অনেকখানি বিভ্রান্তি ফুটিয়ে সে সটান দাঁড়িয়ে রইলো।এই এতসব করতে তার সময় লাগলো বড়জোর সেকেণ্ড তিনেক।ক'জন লোক একই ভঙ্গিতে "পকেটমার, পকেটমার, ধরেন- ধরেন!" চিৎকার করতে-করতে তাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেলো।মানিক মিয়া হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।পরক্ষণেই মানিব্যাগটার কথা মনে পড়ায় টোকাই ছেলেটার খোঁজে ডানে-বায়ে কিছুক্ষণ নজর বুলিয়ে হতাশ হয়ে স্টেশন থেকে বেরিয়ে এলো।আজ তার ভাগ্যটাই খারাপ।পকেট হাতড়ে মানিক মিয়া ৫ টাকার একটা নোট আর দুই টাকার একটা কয়েন বের করলো।ট্যাম্পু ভাড়া ৫ টাকা করে, এই দিয়ে কোনোমতে বাড়ি পৌঁছুনো যাবে।
মানিক মিয়া রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে ট্যাম্পুর জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো। আজ রাতটা চলার মতো ভাত রাধাই আছে, কিন্তু কাল সকালে উনুনে রান্না চড়বে কি করে সে জানেনা। এইসব জাগতিক কথা ভাবতে-ভাবতেই হঠাৎ সে খেয়াল করলো রাস্তার ওপাশে একটা ছোট বেকারী জাতীয় দোকান। মানিক মিয়া রাস্তা পেরিয়ে দোকানটায় ঢুকলো, তারপর কোনোরকম চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই মেয়ের জন্য ৫ টাকা দামের একটা চকোলেট বার কিনে ফেললো। বাড়ি পর্যন্ত আজ পুরোটা পথ তার হাঁটতে হবে। এই পা নিয়ে চলাচলের বড্ড অসুবিধা, তার বাড়ি বেশ দূরের পথ। তবু মানিক মিয়ার দিলখোশ। মেয়েকে আজ সে ম্যাজিক দেখানোর ভান করে শার্টের হাতা থেকে চকোলেটটা বের করে দেবে। তবে তার মেয়েটার যা বুদ্ধি, ঠিক ধরে ফেলবে! তারপর হাসতে-হাসতে বাপের দাড়ি ধরে টানতে-টানতে বলবে "তুমি যে আইজ আমার লাইজ্ঞা মজা আনবা হেইডা আমি জানতাম।"
কাল চুলায় হাড়ি চড়বে কিনা এই চিন্তা এখন আর মানিকের মাথায় আসে না। হঠাৎই তার মনে পড়েছে - পেশাগত কারণ ছাড়াও আরেকটা কারণে সে দাড়ি কাটেনা। তার কণ্যা লিজার বাপের গালভরা দাড়ি খুব পছন্দ।
লু'র হাওয়া বইছে, মানিক দরদর করে ঘামতে থাকে। কিন্তু তার ভেতরটা শীতল এক পরশের ভাবনায় শান্ত হয়ে যায়। মানিক মিয়া হাসি-হাসি মুখে পথ হাঁটে, হঠাৎই তার মনে হয়- আজ আবহাওয়াটা মন্দ নয়!
__________________________
সরকারি চাকুরে
জেনারেল নলেজের বইটা সামনে রেখে ঢুলতে থাকে জায়েদ। সামনে রাখা হাতঘড়িটা বলছে সময় রাত ২ টা বেজে ১৭ মিনিট। জিনিসটা তিথির দেয়া উপহার, মডার্ন ঘড়ি, সেকেণ্ডের কাটা নেই। অথচ এই তিথিই প্রতিবার ফোন রাখার সময় বলতে ভোলে না, ''জায়েদ, তোমার জন্য প্রতিটা মুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই শেষ সুযোগ, এবার টিকতেই হবে।" দুই হাতে মাথা চেপে ধরে সে, ঝাপসা হয়ে আসে সামনে রাখা শব্দমালা। একটা সরকারি চাকরি, তারপর-
তারপর কী সেটা এখনো ঠিক জানেনা সে। আপাতত চাকরিটা হোক, তারপরেরটা তারপর দেখা যাবে।
গ্লাসে রাখা পানি ঢকঢক করে গিলে নেয়, পর্দাটা সরিয়ে জানালা খুলে দেয়- একটু বাতাস প্রয়োজন, একটু অক্সিজেন। আজ বোধহয় জোছনা। মফস্বলী চাঁদ, গরিমা একটু কম হলেও চোখে ধরা পড়ে। ক্যাপবিহীন কলমটা টেবিলে ঠুকতে-ঠুকতে হঠাৎই নিষিদ্ধ ভাবনা মাথায় আসে- কী হয় সরকারী চাকুরে না হলে! নয়টা পাঁচটা কর্পোরেট ঘণ্টা শেষে ২০ টাকা বাঁচানোর তাগিদে হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরলে? আব্বার কুঞ্চিত মলিন মুখ, মায়ের হঠাৎই পাড়াবিমুখী স্বভাব, তিথির হয়তো অন্য কোথাও-
জোছনাটা হঠাৎ ফিকে হয়ে গেল কি? মাথা নেড়ে মুখস্থ করে জায়েদ, "মাওরিরা নিউজিল্যান্ডের অধিবাসী, সর্বশেষ স্বাধীন রাষ্ট্র দক্ষিণ সুদান।"
__________________________
এ জন্ম তো কেটেই গেল
টিউশনি শেষে রাস্তায় দাঁড়িয়ে অনিমেষ খামটা খোলে, পাঁচশ টাকার একটা নোট কম আছে। মুখে স্মিত এক হাসি নিয়ে সে ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে এসে বসে। শেষ সিগারেটটা ঠোঁটে গুজে জীবনের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ভাবতে শুরু করে। বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে তবু চাকরি হচ্ছে না, ছয়টা টিউশনি দিয়ে মেস ভাড়া, বাবার অষুধ -সব সামলে ওঠা সম্ভব হচ্ছে না আর। ক'দিনের ভেতর একটা চাকরি না জুটলে চোখের সামনেই দেখতে হবে প্রতিমা বিসর্জন। এতশত জৈবিক তাড়নার ভেতর বেঁচে থাকা দুষ্কর। ছেলেবেলার লোডশেডিঙের সন্ধ্যাগুলো যেমন পাড়ার ছেলেগুলোর সাথে লুকোচুরি খেলে কাটতো, সাফল্য তার সাথে এখন তেমনিভাবে লুকোচুরি খেলছে। ধরা দেই-দেই করেও দিচ্ছেনা। রিটেনে সে টিকে যায় অনায়াসেই, যত গন্ডগোল সব ভাইবাতে গিয়েই বাধে। মৃদু হেসে মাথা নাড়ে অনিমেষ, এতসব দুশ্চিন্তা সে দীর্ঘশ্বাসে উড়িয়ে দেয়।তপুর একটা গান আছে না- এতো ভেবে কী হবে/ ভেবে কে করেছে কী কবে/ভাবছিনা আর/যা হবে হবার!
সন্ধ্যে মিলিয়ে গেলে অনিমেষরা ক'জন বন্ধু মিলে আজাদদের ছাদে আড্ডা জমায়। বুকের ভেতরের শূণ্যতা কাটাতে একের পর এক গানে সুর তোলে।শূণ্যতা তো কাটেই না, বরং অদ্ভুত এক হাহাকার দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়তে থাকে প্রতিটি কোষে, প্রতিটি নিউরনে-নিউরনে। ঝুপ করে রাত্রি নামে, এক এক করে আকাশের অলি-গলিতে উঁকি দিতে থাকে বিশাখা, স্বাতী আর চিত্রা। টুং শব্দে টোস্ট করে অনিমেষ- টু ব্যাটার ডেইজ এ্যাহেড। চোখের সামনে ভেসে ওঠে সত্যিকারের ভবিষ্যৎ-চিত্র। অনিমেষ এসব চিন্তা ঝেড়ে ফেলার আশায় মিছে মাথা নাড়ে।নিজেকে নিজে বুঝ দেয়- আর ক'টা দিন সবুর করো, রসুন বুনেছি।
সুদিন, কাছে এসো!
0 Comments