ভ্রমণ: হাজংপাড়া



চরাচর: হাজংপাড়া সীমান্তে প্রশান্তির সন্ধ্যা
সুমন কুমার 

সহকর্মীর সাথে যাব হাজংপাড়া গ্রামে, সেখানে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত। সীমান্তের সন্ধ্যা উপভোগ করাই উদ্দেশ্য। হাজংপাড়া ময়মনসিংহ জেলার অন্তর্গত ধোবাউড়া উপজেলাস্থ ঘোষগাঁও ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী একটি গ্রাম। সহকর্মী শফিউল ভাই ব্যবহার করেন জাপানি সিডি এইটটি মোটরসাইকেল। ধোবাউড়া বাসস্ট্যান্ড থেকে তার পেছনে সওয়ার হই। যন্ত্রটির বয়স কুড়ি বছরের অধিক। শফিউল ভাই বলেন ভেঙে টুকরো টুকরো না হওয়া পর্যন্ত এ যন্ত্র চলবেই। ওর পিঠে যতই ওজন চাপানো হোক না কেন চাকা ঘুরবেই।

ঘোষগাঁও বাজার পার হতেই গারো পাহাড়ের সারি আকাশ আটকে দাঁড়িয়ে আছে। সেই প্রকা- পাহাড়ের সম্মানে তাকে অতিক্রম করার বদলে ডানহাতে রেখে চলতে শুরু করি। সেখানেই আমরা পিচের কালো রাস্তা ছেড়ে নামি ইটের হেরিংয়ে। মাঝে মাঝেই ডানে বায়ে পাহাড়ি ঝিরি বইছে কুলকুল শব্দে। তার দুইধারে কেয়া ঝোঁপ দেখে অবাক হই, এখানেও কেয়া ফোঁটে! 

কিছুটা অগ্রসর হতেই নিতাই নদ। কী গভীর! দুইপাড় সমান উঁচু। নদীর এপাড় ভাঙে ওপার গড়ে এই নিয়মের বড় ব্যত্যয় যেন! তার তলানী দিয়ে জল বইছে নীরবে। কোথাও এক দুই ফুট গভীর, কোথাও কয়েক ইঞ্চিমাত্র জল। চিকচিকে লালাভ মোটাদানার বালি বেরিয়ে আছে। ভেতরটা একেবারেই ন্যাড়া। জলজ লতাগুল্ম চোখে পড়ছে না। নদীকে ডানহাতে রেখে বামপাড় ধরে এগিয়ে যাই আরও চার পাঁচ কিলোমিটার। পাড়ের বাঁশঝাঁড় নুয়ে কঞ্চির অগ্রভাগের দুই একটি পাতা কখনও সখনও আমাদের মাথায় ছুঁয়ে স্বাগত জানাচ্ছে পথ জুড়ে। বেতের ঝোঁপে বেতুলের থোকাগুলো লোভনীয় রঙসহ ঝুলে আছে। এইসব দৃশ্য দেখতে দেখতে দ্রুত ধাবমান সর্পিল নদীকেও ডানহাতে রেখে গ্রামের ভেতর অপেক্ষাকৃত কম প্রশস্ত ছোটো মাটির রাস্তায় ঢুকে যাই।

সীমান্তের যত কাছাকাছি পৌঁছাই তত বাঙালিদের সাথে গারো-হাজংদের বাড়িঘরের মিশ্রণের অনুপাত বাড়তে থাকে। একজন গারো নারীকে দেখলাম, পিঠের ওড়নায় শিশু সন্তান বাঁধা। তাতে কাজ করার জন্য দুইটি হাত মুক্ত থাকে। তিনি পাহাড়ি ঝিরি থেকে ঢেঁকিকলে জল তুলে তুলে বেগুনের ক্ষেতে সেচ দিচ্ছেন। ওরকমটা আমাদের বাঙালি সমাজে হয় না। তখন রবির কিরণ একেবারেই নিস্তেজ, মিঠে হয়ে এসেছে।

ততক্ষণে ধোবাউড়া বাজার থেকে বারো কী চৌদ্দকিলো পথ চলে এসেছি। নীচু খাকি রঙের দেয়ালের ভেতর টিনের আধাপাকা কয়েকটি ঘর চোখে পড়ে। সারি সারি ফুটো দেয়ালের ভেতরপাশে বালির বস্তা এমনভাবে সাজানো যেন ছিদ্রগুলো বন্ধ না হয়। চত্বরের ভেতর চারপাশে ওয়াচরুম আর একটি ওয়াচ টাওয়ার। এঁরা সীমান্তের নিরাপত্তারক্ষী-আমাদের বিজিবি। যুদ্ধ-বিগ্রহ লাগলে দেয়ালের ওই ফুটো দিয়েই উত্তপ্ত বুলেট বেরিয়ে আসে। গেটেই দুজন বন্দুকধারী অলস ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন। পাশেই অভ্যর্থনা কক্ষ, রাস্তার দিকে ওটার গায়ে লেখা আপনার পরিচয় দিন। ভেতরে আরও কয়েকজনকে দেখলাম, তারা সাদা স্যান্ডোগেঞ্জি আর খাকি হাফপ্যান্ট পরিহিত, বাহারি ফুলগাছগুলোর যত্ন নিচ্ছেন।

বন্দুকধারীদের সামনে দিয়ে পুরাতন মোটরসাইকেলের ধোঁয়া উড়িয়ে আমরা আরও অগ্রসর হই। তারা আমাদের দেখেও যেন দেখে না। বিজিবি ক্যাম্প থেকে শ’দুয়েক মিটার পার হতেই রাস্তার ধারে সাইনবোর্ড দৃশ্যমান হয়। দুইটি হাড়ের ক্রসের ওপর একটি করোটি- সাবধান, সামনে ভারত। পার হই আরও দুশো মিটারের মত। সামনে রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে আছে কাঁটাতারের বেড়া, অনুমান কুড়ি ফুট উঁচু। আমরা ওই বেড়া থেকে একশো মিটার দূরে থামি। সেখানে মাটির রাস্তাও শেষ হয়েছে। 

কাঁটাতারের ওপারে ভারতের মেঘালয় রাজ্য। বেড়ার ওপাশ ঘেঁষে বইছে ছোটো একটি ঝিরি। জোরে সোরে লাফ দিলেই পার হওয়া যাবে এমন দূরত্ব দুই পাড়ের মধ্যে। ওপারে কয়েকটা বাড়ি। বাড়ির বাইরে ধানের গোলা, টিউবওয়েল, গরু বাঁধা, ছাগল চরছে, আট দশটি বাচ্চা নিয়ে ঘুরছে একটি মা মুরগি। একটা খেলার মাঠ, সেখানে ক্রিকেট খেলছে দুরন্ত ছেলেরা। দূরে গাছের ওপর দিয়ে যিশুর ক্রস উঁকি দিচ্ছে। ওপারের পাহাড়গুলো এপারের চেয়ে তুলনামূলক উঁচু আর সবুজ। ওই পাহাড়ের নাম দক্ষিণ গারো পাহাড়। কী অদ্ভুত, বাংলাদেশ মেঘালয়ের দক্ষিণে অবস্থিত! আর ওপারের একই পাহাড়ের সারির নাম দক্ষিণ গারো পাহাড়। তবে কি ওই পাহাড় সারির ওপারে আরও কোন গারো পাহাড় আছে, যা মূল গারো পাহাড় বা উত্তর গারো পাহাড় নামে পরিচিত?

সীমান্তের কাঁটাতার ঘেঁষে ওপারে লাইটপোস্ট। সেগুলোর মাথায় বড়ো বড়ো সার্চলাইট। গাছের ফাঁকফোক দিয়ে সুউচ্চ ওয়াচ টাওয়ারও দেখা যাচ্ছে, কাছাকাছি একটির ওপর ওপারের একজন সীমান্তরক্ষীকেও দেখলাম। একটা বাজপাখি বিশালাকার বৃত্ত তৈরি করে নির্ভয়ে মুক্ত আকাশে উড়ছে। সেই বৃত্তের দক্ষিণ ব্যাসার্ধ বাংলাদেশে আর উত্তর ব্যাসার্ধ ভারতের মেঘালয় রাজ্যে, ওর ওড়াউড়িতে রাজনীতির নিয়মে কোন সীমান্ত বাধ সাধে না। আমরা অনুমান করার চেষ্টা করি ওপার থেকে কোন গুলি ছুটে এলে তাতে আমাদের বিদ্ধ হওয়ার সম্ভবনা কতটা। বুলেটের ভয়ে নড়াচড়াতেও কিছুটা আড়ষ্টতা বোধ করি। সীমান্তে কেন এত ভীতি, কেন সেটা মিলনস্থান না হয়ে আজন্ম যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে আছে, কে এই যুদ্ধ ঘোষণা করে রেখেছে?

সূর্য ডুবু ডুবু। আমাদের ফিরতে হবে। দিনমনি অস্তে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ে সন্ধ্যা ঘন হয়ে যায়। সীমান্তে এর অধিক গভীর সন্ধ্যায় পর্যটক হয়ে অবস্থান করা নিরাপদ হবে না বলে আমরা মনে করি। বাম হাতে কয়েকটি বাঙালিবাড়ি। আমাদের ডানে কেবল একটিই বাড়ি। এতক্ষণ বাড়িগুলো খেয়াল করিনি আমরা। ডানের বাড়িটি তুলনামূলক অসচ্ছল কিন্তু পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। কোন রকম একটি রান্নাঘর, তার পাশে দক্ষিণমুখী একমাত্র ছাপড়া ঘরের বারান্দায় একজন বয়োবৃদ্ধ কাঠের পুরাতন চেয়ার পেতে বসে আছেন। তার পাশে মোড়ায় বসা তারই স্ত্রী। এঁরা গারো দম্পতি, আমরা দেখেই বুঝতে পারি। তাছাড়া বাড়িঘর এবং তৈজসপত্রেও তাদের নৃতাত্বিক চিহ্ন এবং ঐতিহ্য দৃশ্যমান। 

গারোগণ মঙ্গোলয়েড। যদিও উভয়ের মুখের চামড়া ঝুলে গেছে তবু তাদের বয়স বুঝতে পারি না আমরা। হয়ত সত্তর কিংবা আশি, নব্বইও হতে পারে। তাদের বসার ভঙ্গিতে আকৃষ্ট হই। তারা কী আলাপ করছেন সে সবের কিছুই আমাদের কানে আসে না। তাছাড়া মান্দি ভাষাও আমাদের অজানা। তবু বুঝতে পারি এমন কোন আলাপ করছে যার মর্মার্থ কেবল শান্তি। সীমান্তের গা ঘেঁষে বাড়িটি সাধারণ দৃষ্টিকোনে চূড়ান্ত অনিরাপদ স্থান। সেখানে নিশ্চিন্ত মনে তারা যে আলাপেই মগ্ন থাকুন না কেন তাতে সীমান্তের কোন অনিশ্চয়তা স্পর্শ করেনি, আমরা অনুধাবন করি।

সন্ধ্যা ঘন হয়ে আসছে। পাখিরা গান গাইছে। আমরা চোখ ফিরিয়ে নিই। ফেরার তাগিদে যন্ত্রের পিঠে চড়ে বসি। দাম্পত্য সুখের চিত্র বলতে ওই গারো দম্পতি আমার চোখে স্থায়ীভাবে বসে যায়। এরচেয়ে সুন্দর দৃশ্য কোন গারো পাহাড়, কোন নিতাই কিংবা পাহাড়ি আকাবাঁকা নদ-নদী নয়। তাদের ভাঁজপড়া মুখগুলো এখনও দেখি। বারবার হাজংপাড়া সীমান্তে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। পরক্ষণে অনুধাবন করি, সূর্য ডোবে, পাখি গান গায়, দম্পতিরা পাশাপাশি বসে গল্প করে কিন্তু এই দৃশ্য সব সময় থাকে না, কখনও কখনও তৈরি হয়।

Post a Comment

0 Comments

Close Menu