যে জীবন প্রার্থিত
আরিফুল হাসান
কবিতাকে অবসরের বিনোদন ভাবলে কবিতাও তোমাকে অবসর ভাতার মতো সামান্য কিছু দেবে। কবিতার জন্যই জীবন থেকে অবসর নিয়ে নিলে জীবনটাই কবিতা হয়েছে যায়। কবি সৈয়দ আহমাদ তারেক বলেন, অবসর অফুরন্ত।
পৃথিবীর সবকিছুই ঠিক ঠিকঠাক মতো চলে যায়। প্রাণের শুধু নীরব দর্শকের ভুমিকা ছাড়া আর কোনো কাজ নেই। তা প্রাণ মানেই বয়ে চলা। তরঙ্গের মতো, হিমেল প্রবাহের মতো সে শুধু বয়ে চলে। এই বয়ে চলার ক্ষান্তি নেই। অফুরন্ত অবিরাম এই আখ্যান রচিত হয় প্রকৃতির খামে। তাই যুগযুগ ধরে প্রাণের উত্তর রূপ জন্মাতে থাকে এবং বিবর্তনে এক সময় প্রাণের অস্তিত্ব লোপ পায়। আবার এই লোপ বিলুপ থেকে একটি পরম্পরা জেগে উঠে ইকারুস, তারা ফিনিক্স।
এই জীবন আগুনের প্রজ্বলন থেকে, বায়ুর শনশন থেকে, ফুরাতনদীর ঢেউগুলো থেকে উপচে উঠে দুঃখ, এই দুখের উপাচার কবিতা। আবার যা কিছু অন্ধ, যা কিছু তীরন্দাজ এ সবেরই সংজ্ঞার্থ কবিতা। অন্যভাবে আবার হাসি আনন্দটুকুই কবিতা। কিন্তু না, হাসি আনন্দের অধিক, কান্না বেদনার উর্ধ্বে, নদীর ঢেউ, পাখির ডাক, আগুনের ভাষা, আর বাতাশের শনশন থেকেও আরো ব্যাখ্যাহীন, আরও বেশি বিমূর্ত কবিতার অবয়ব। এটিকে ঠিক অবয়ব ভাবা যায় কিনা সে বিষয়েও সন্দেহ আছে। আবার অবয়বই কবিতা কিনা সে ব্যাপারে আছে প্রশ্ন। ভাষা না ভাব, ছন্দ না অলংকার, রূপ না রস ঠিক কোন যায়গায় কবিতা আটকে আছে তা-কি কেউ কখনো বলতে পেরেছে? তবু বলা হয় 'মিস্ট্রিটাই কবিতা।' আর এই কবিতার মিস্ট্রিতে পড়ে বালুচরে ডুবে যেতে যেতে পাঠক যখন আরো বেশি ডুবে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করে তখন কবিতা হয়ে উঠে সংক্রামক। তাহলে কি অসুখটাই কবিতা। কেউ কেউ বলেন, কবিতা এক অবাক অসুখ। যার হয় তার সয় না দুনিয়াদারি। এই দুনিয়াদারি ছেড়ে যে ভয়ানক ভাবে কবিতায় মগ্ন হতে পারে কবিতার ষোড়শী তার সামনে ততবেশি নগ্ন হতে থাকে। আর সে দেখতে পায় ভেতর থেকে ভেতরে, আরো ভেতরে, আরো আরো গভীরের ভাষা। এবং সে পাঠ করে কালের কঙ্কালে মাংসল প্রলেপ লাবণ্যরেখায় ভ্রুক্ষেপহীন। এবং তার মনে হতে থাকে সবকিছুই ছাই ছাই, মিথ্যা মিথ্যা, বিমর্ষ ও বিহঙ্গের মিথ। তখন তার উদাসীন মন আরও বেশি ছন্নছাড়া হয়ে কাঁদে আর তাই বুঝি পরিযায়ী পাখির ডানায় লেগে থাকে রাতের বেহাগ।
মিথ ও সত্যের মধ্যে তফাৎটা কবি ধরতে পারে আর আরশী ডানায় চড়ে চলে যেতে পারে দীর্ঘতরো পথে। আর এভাবেই পাহাড়ে, অরণ্যে এবং জলরাশির ভেতর সে তার সত্যকে খোঁজে। মেঘের মায়ায় গেঁথে রাখে দীর্ঘ যাত্রার পথ। এভাবে অস্তমান থেকে, আলোর খোরাকে কবি ঘি ঢালেন বিমর্ষ তৃষ্ণায়। তবে কী কবি মৃত? বীতরাগ, শ্রদ্ধাহীনতা, আর পাত্তা না দেয়ায়ই কবিতার শক্তি? এ শক্তি থেকে কবি কী উৎপাদন করেন? কবি কি শ্রমিক যে উৎপাদন করবে? কবি হচ্ছে সবচেয়ে সুখী মানুষ, অবসর প্রাপ্ত। আবার কবির মতো নিষ্ঠাবান কেউ নেই। সে যখন লেখে, তখন দেহটা ছাই করেই লেখে, মগজের প্রতি কোষে যুদ্ধ জেহাদ বাঁধিয়ে সেখান থেকে মানবতার বিজয় এনে দিয়ে তবেই কবির ক্ষান্তি। তবে শেষ বলে কিছু নেই। ক্লান্তি থেকে ক্ষমা চেয়ে মানব জন্মের ইতিহাস হয়ে তারপর আবার প্রকৃতিমগ্নতায় বৃষ্টি হতে চায় কবির হৃদয়, চায় বর্ষা হতে। কদম ফুল হয়ে ফুটে থাকতে চায় সবুজের ভেতর। কবির এ সবুজমগ্নতা অতঃপর তাকে আরো বেশি উৎকৃষ্টতার ভেতর নিয়ে যায়। সে তখন ‘জীবে দয়া করে যে জন’ এমন কবিতা লেখে। তারপর কবির হয় কারাবাস। জীবন সংসারটা তার কাছে কারাপ্রকোষ্ট হয়ে উঠে। সে তখন মুক্তি চায়। তীব্রভাবে মুক্তি চায় মানবজন্ম থেকে। পাখি স্বভাবে, সে তখন শিস দিয়ে দিয়ে উড়ে যেতে চায় নীল-নীলিমা পেরিয়ে। চায় মেঘ হতে। চায় মুক্তি হতে।
এখন তো কবির অবগাহনের পালা। ভাবের দোলায় দোলতে দোলতে কবি তখন অসীম নক্ষত্রের পানে চেয়ে থেকে জ্যোৎসনার আলোতে গোসল সেরে নেয়। আর নিবিষ্ট পূর্ণিমার প্রতিটি রশ্মিভাষা নিজের মতো করে লেখে সুর দিয়ে। সে জীবন কাঙ্খিত সবার, কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের বর্তমান, আর অনাগত কবিতা রাজ্যের কুয়াশা তাকে পুজির মুখোমুখি অসহায় করে দেয়। তবে সিংহকবি সেটি তাচ্ছিল্য করে এবং বেঁচে থাকে অকবিতা থেকে। এসব বেঁচে থাকা তাকে যুগযুগান্ত থেকে দীর্ঘায়ু করে এবং তার থাকা-না থাকা সম্পর্কে দেউলিয়াত্ব এনে দেয়। এখানেই কবির অগ্রাহ্য অমরত্বকে, এখানেই কবির প্রত্যাখ্যান। এই প্রত্যাখ্যান সতত সুন্দর, পরাজিত হতে হতে কবি মূলত জিতে যান। নিষ্ফলা চাষবাস করতে করতে ভরে উঠে তার গোলাও। এবং সে স্বর্ণশষ্যে পৃথিবীর মাটি উর্বর হয়।
কবি এক আদিম অগস্তযাত্রা। আবার সভ্যতা নামের কলঙ্কটির পেছনে রয়েছে অসংখ্য নির্যাস, যা তাকে আবার গুহামুখী করে এবং রক্তাক্ত তিতিরের সামনে কাঁদতে বসায়। তবু কবি কান্নাজয়ী বীর। অশ্রু দিয়ে লেখে দেয় জীবন-উল্লাস। আর এ উল্লাসে উদ্ভাসে পাঠক হারায় তার দুঃখবোধ। আপনার জগৎ ছেড়ে অন্য কোনো মাকামে, লা মাকামে সে তখন অবস্থান করে। এটি জিরো পয়েন্টের মতো, নো ম্যান্স ল্যান্ডের মতো। তাই কবির কোনো জীবন থাকে না, না কোনো দেশ থাকে, না থা

0 Comments